নিজস্ব প্রতিবেদক :
**খুলনা:** দীর্ঘ দেড় দশক ধরে মোংলা বন্দরের জাহাজ থেকে পণ্য খালাশ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে একটি প্রভাবশালী ক্যারিয়ার সিন্ডিকেট—এমন অভিযোগে নৌপরিবহন খাতের ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও সিন্ডিকেটের প্রভাব কমেনি; বরং নানা কৌশলে তারা আবারও শক্ত অবস্থানে ফিরে এসেছে।
### 🔎 সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ কীভাবে
সূত্র জানায়, ২০১০ সালে তৎকালীন নৌপরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব অ্যাডভোকেট মো. সাইফুল ইসলাম ১৩ জন ক্যারিয়ার নিয়োগ দেন। সময়ের ব্যবধানে কয়েকজন ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া ও মৃত্যুবরণ করায় বর্তমানে ৭-৯ জন ক্যারিয়ার পুরো খাত নিয়ন্ত্রণ করছেন। এদের মধ্যে ২৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মিনহাজ উজ জামান সজলের মেসার্স প্রমিজ ট্রেডার্স এবং শেখ জুয়েলের ঘনিষ্ঠ উজ্জল গাঙুলীর মেরিন শিপিং উল্লেখযোগ্য।
দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর মালিক গ্রুপে নির্বাচন না হওয়ায় নতুন ক্যারিয়ার নিয়োগ বা পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে গড়ে ওঠে একচেটিয়া সিন্ডিকেট।
### 💰 ভাড়া ও ডেমারেজে অনিয়মের অভিযোগ
ব্যবসায়ীরা জানান, ক্যারিয়াররা জাহাজ থেকে পণ্য খালাশ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেন এবং এ বাবদ ভাড়া ও বিলম্ব মাসুল (ডেমারেজ) আদায় করেন। কিন্তু সেই অর্থ কার্গো মালিকদের যথাসময়ে প্রদান করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে মাসের পর মাস ঘুরতে হয় পাওনা টাকার জন্য।
মালিক গ্রুপের একটি হিসাবে দেখা গেছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত শুধু ডেমারেজ বাবদ প্রায় ১০ কোটি টাকার বেশি বকেয়া জমেছে। অভিযোগ রয়েছে, অন্যের কার্গো ব্যবহার করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন ক্যারিয়াররা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কার্গো মালিক বলেন, “তিন ক্যারিয়ারের কাছে আমার প্রায় ২৭ লাখ টাকা পাওনা। অভিযোগ করলে টাকাও ফেরত পাব না—এই ভয়ে আছি।”
### ⚖️ নতুন উদ্যোগ থমকে গেল আদালতে
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিএনপি সমর্থিত ব্যবসায়ীরা পুরোনো সিন্ডিকেট ভাঙতে নতুন ক্যারিয়ার নিয়োগের উদ্যোগ নেন। চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি প্রথম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও তা প্রভাবশালী মহলের চাপে প্রত্যাহার করতে হয়।
পরবর্তীতে ৩ মার্চ দ্বিতীয় দফায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলে ২৭ জন আবেদন করেন। কিন্তু যাচাই-বাছাইয়ের আগেই ২ এপ্রিল ৬ জন বিদ্যমান ক্যারিয়ার আদালতে মামলা করে স্থগিতাদেশ নেন। এতে পুরো প্রক্রিয়া থমকে যায় এবং পুরোনো সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার হয়।
### 🚫 হয়রানির অভিযোগ
সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেন, যারা সিন্ডিকেট ভাঙতে বা নতুন ক্যারিয়ার নিয়োগে কাজ করছেন, তাদের প্রশাসনিকসহ বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। এমনকি মালিক গ্রুপের নির্বাহী কমিটির কিছু সদস্য নিজেরাই নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে মামলা করে প্রক্রিয়া বন্ধ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
### 📊 ক্ষমতার প্রভাব ও বৈষম্য
আরেক নৌপরিবহন মালিক বলেন, “প্রভাবশালী ক্যারিয়াররা নিয়মিত ট্রিপ পায় ও ভাড়া পায়। অথচ আমরা দেড়-দুই মাসে একটি ট্রিপও পাই না, ভাড়াও ঠিকমতো পাই না।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, কিছু অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হচ্ছে।
### 🏢 নতুন কমিটির উদ্যোগ
অভ্যুত্থানের পর নৌপরিবহন মালিক গ্রুপে প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতি নির্বাচিত হন সৈয়দ জাহিদ হোসেন এবং মহাসচিব হন মো. মফিজুর রহমান।
নতুন কমিটি দায়িত্ব নিয়ে সমবণ্টন পদ্ধতি চালু, বকেয়া আদায় এবং শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তবে নানা প্রতিবন্ধকতায় কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
### 🗓️ সামনে কী
সংগঠনের সভাপতি সৈয়দ জাহিদ হোসেন বলেন, “আমরা নৌপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কাজ করছি। নতুন ক্যারিয়ার নিয়োগের উদ্যোগ আদালতের কারণে বন্ধ রয়েছে। আগামী ২৫ এপ্রিল সাধারণ সভায় সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
### ⚠️ আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সিন্ডিকেট ভাঙা ও স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা না গেলে মোংলা বন্দরের পণ্য পরিবহন খাতে অচলাবস্থা আরও গভীর হতে পারে, যা জাতীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
প্রিন্ট করুন
ফটো কার্ড
এ জাতীয় আরো খবর..